ছবি: শীতের আগাম সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে।
শীতের আগাম সবজি শিম, ফুলকপি ও মুলা বাজারে উঠতে শুরু করেছে। তবে নতুন সবজি বাজারে এলেও দাম কমার স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। কিছু সবজির দাম আরও বেশি। এর মধ্যে কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। মাছ ও মাংসের দাম গত সপ্তাহের মতোই রয়েছে। তবে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় নেমেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও এলাকার কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। ফুলকপি প্রতিটি ৭০ টাকা এবং মুলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজিতে। বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটল ও কাঁকরোলের মতো সাধারণ সবজির দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি। এসব সবজির বেশির ভাগ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। তুলনামূলক কম দামে শসা পাওয়া যাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। তবে দেশি শসার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি দরে। লাউয়ের দাম আকারভেদে ৪০ থেকে ৬০ টাকা।
বাজারে বেগুন ও টমেটোর দামও বেশি। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা এবং গোল বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। টমেটোর কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। বরবটি, ঝিঙে ও করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। কচুরমুখির দাম কেজিতে ৮০ টাকা।
সবজির উচ্চমূল্যের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কাঁচা মরিচের বাজারে। কয়েক সপ্তাহ আগে কাঁচা মরিচের কেজি ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সরবরাহ বাড়ায় এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার করতে আসা আবুল কালাম মাহী বলেন, ১৪০ টাকা দিয়ে দুটি ফুলকপি কিনেছেন। নতুন সবজি হওয়ায় বেশি দাম দিয়েও কিনেছেন। একটি লাউ কিনেছেন ৫০ টাকায়। এ ছাড়া এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনতে খরচ হয়েছে ৪০ টাকা। সবজির বাজারে বাড়তি খরচের পাশাপাশি মাছ-মাংস কিনতেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে চড়া দাম। বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে। সোনালি মুরগির দাম ৩১০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা। ডিমের বাজারে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৪০ টাকা এবং চারটি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় ডজনপ্রতি দাম কমেছে ১০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রেতা মাহীন সারওয়ার বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা কমলে পরের সপ্তাহে আবার ১০ টাকা বেড়ে যায়। ফলে দাম ঘুরেফিরে ২০০ টাকার আশপাশে থাকে। সোনালি মুরগির দামও ৩১০ থেকে ৩২০ টাকার মধ্যে রয়েছে। শুক্রবার তিনি ৩১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। কাজীপাড়া এলাকার ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন জানান, বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। গত সপ্তাহে ১৫৫টা ডজন বিক্রি করেছেন। মাছের বাজারেও দামের তেমন পরিবর্তন নেই। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে। রুই ও কাতলার দাম ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বড় আকারের রুইয়ের কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কইয়ের কেজি ৩০০ টাকা। পোয়া বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে ক্রেতাদের কেজিপ্রতি এক হাজার টাকার বেশি খরচ হতে পারে। মাছের আকার, ধরন এবং জীবিত না মৃত, তার ওপরও দাম নির্ভর করছে। একই মাছের দাম একেক বাজারে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমবেশি হতে দেখা গেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব চালের বাজারে: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চালের বাজারে। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের চালের দামও কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম বাড়ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল কেজিতে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এসব চালের দাম ছিল ৭২ টাকা। রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের কেজি ৬৫ টাকা, যা এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে ২ টাকা কম ছিল। মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৬ টাকা কেজি দরে।
নাজিরশাইল চালের দামও বেড়েছে। মানভেদে এ চালের কেজি ৭০ থেকে ৯৫ টাকা। বিক্রেতাদের হিসাবে, এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে এ চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দামও বেড়েছে। এসব চালের কেজি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাল পরিবহনে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে মিল ও পাইকারি বাজারে চাল পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক ধাপে পরিবহনের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব চালের দামে পড়তে পারে। কাজীপাড়া এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চাল পরিবহনে খরচ বেড়েছে। পাইকারি বাজার থেকে আগের দামে চাল কেনা যাচ্ছে না। ফলে বেশি দামে চাল কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরু চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ক্রেতারা দোকানে এসে দাম শুনে আগের তুলনায় কম চাল কিনছেন। কেউ কেউ বেশি দামের চাল না কিনে তুলনামূলক কম দামের চাল নিচ্ছেন। এতে ক্রেতাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা বাজারেও চালের দাম কমতে পারে। তবে পরিবহন ব্যয় ও ধানের দাম না কমলে চালের দাম কমার সম্ভাবনা কম। ক্রেতারা বলছেন, চালের দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই বেশি। এর মধ্যে চালের দাম বাড়ায় মাসের বাজার খরচ আরও বেড়েছে। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পক্ষে বাড়তি খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের চাল কেনা যেত, এখন একই পরিমাণ চাল কিনতে বেশি টাকা লাগছে।
ক্রেতাদের দাবি, বাজারে নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি চালের দাম বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মিরপুর-৬ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী শাহিন আলম বলেন, চালের দাম বাড়ায় মাসের বাজার খরচ সামলাতে চাপ তৈরি হচ্ছে। সংসারের অন্যান্য খরচও বেড়েছে। এর মধ্যে চালের দাম বাড়লে অন্য পণ্যের কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হয়। কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দার মাহাতাব উদ্দিন জানান, বাজারে প্রায়ই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়ে। বাজারে নিয়মিত তদারকি বাড়ানো এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ধানের ক্রয়মূল্য, মিল পর্যায়ের দাম, পরিবহন ব্যয় ও খুচরা বিক্রির মূল্য যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকির মাধ্যমে সরবরাহ ও বিপণন পর্যায়ে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।